বুধবার, ১২ এপ্রিল, ২০১৭

প্রবন্ধ, ছোট গল্প, নাটক ও রম্য

'এপ্রিল ফুল!'

সকালের চা টা বিপত্নীক হওয়ার পর একাই খান বিকাশ বাবু। বউমা ঘুম থেকে উঠে চা বানিয়ে দেয়, একটু ব্যাজার মুখে দিলেও কিছু মনে করেন না তিনি। যতই হোক, গোটা দিন কত খাটনি মেয়েটার। একটা সংসার সামলানো কি চাট্টিখানি কথা?!
ছেলে সুপ্রতিষ্ঠিত, মোটা টাকা মাইনে পায়। বড় গর্ব হয়, মানুষের মতো মানুষ করে তুলেছেন তিনি ছেলেকে।
আজ সকাল থেকেই ছেলে প্রচন্ড ব্যস্ত, অফিসের কাজে। 31st মার্চ যে।
রাতে শুনলেন ছেলে বউ এর ঘর থেকে একটু কথা কাটাকাটির আওয়াজ। তেমন পাত্তা দিলেন না তিনি, ওসব একটু হতেই পারে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে।
পরদিন সকালে চা টা ছেলেই নিয়ে এল, একটু অবাক হলেও খুশী হলেন মনে মনে।
- "বউমার শরীর খারাপ নাকি বাবা?"
- "না। আমার কিছু কথা ছিল তোমার সাথে।"
- "হ্যাঁ, বল না। কথাই তো হয়না আর তোর সাথে।"
- "আসলে.. তোমার বউমা আর মানে আমাদের মনে হয় তোমার এখন একটু নিজের বয়সী লোকজনের সাথে থাকা উচিত। আর তোমার বউমাও আর এত চাপ নিতে পারছে না।"
- "হ্যাঁ, মেয়ে টা খুব খাটে। কিন্ত নিজের বয়সী বন্ধু আর পাই কোথায় বল, এই কমপ্লেক্সে তো কেউই নেই তেমন। যা দু একজন ছিল তারাও তো পটল তুলল। হে হে।"
- "বাবা আজ তোমাকে একটা ওল্ড এজ হোমে দিয়ে আসব, আমরা দুজনেই ঠিক করেছি তুমি ওখানেই ভালো থাকবে। তোমার ব্যাগ তোমার বউমা গুছিয়ে দিচ্ছে।"
কথা গুলো এক নিঃশ্বাসে বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ছেলে। বিকাশ বাবু প্রথমটা হতভম্ব হলেও তার বেশিক্ষণ লাগল না বুঝতে, আজ যে 1st April, ছেলে তো তাকে বোকা বানাচ্ছে। কি সুন্দর অভিনয় করে গেল, হাসলেন তিনি।
তিনিও ঠিক করলেন অভিনয় তিনিও করবেন।
কাঁদার অভিনয় করা কি কঠিন, গাড়িতে বসে মনে মনে হাসলেন তিনি। গম্ভীর মুখে গাড়ি চালাচ্ছে ছেলেটা।
শহরের এদিকটা দেখতে দেখতে বেশ বড় হয়ে গেছে, যেমন ছেলেটা হয়েছে। ছোটবেলায় চায়ে নুন মিশিয়ে এপ্রিল ফুল করত, এখন বড় হয়ে এসব বড় নাটক করছে। মুখ টিপে হাসলেন আবার, জেনে বুঝে নাটক করার মধ্যে একটা পৈশাচিক আনন্দ আছে।
ওল্ড এজ টা একটু গ্রামের দিকেই, বেশ সুন্দর সাজানো। তবে যারা থাকে তাদের জন্য খারাপই লাগে।
ছেলেটা নিশ্চয়ই কোম্পানির কোন ডোনেশান দিতে এসেছে, তাই এত নিখুঁত ভাবে প্ল্যান টা করেছে।
কারো সাথে একটা পরিচয় করাতে নিয়ে আসছে ছেলে, এখানকার ম্যানেজার হয়ত।
পরিচয় পর্ব শেষ হতে ছেলে বলল, "ভালো থেকো। মাসে দুবার তো আসবই দেখা করতে। কোন অসুবিধা হলে ফোন করো।"
আবার অভিনয় করার পালা, হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির কাছে এলেন দুজনে। বললেন, "তোমরাও ভালো থেকো বাবা। আমার আশীর্বাদ তোমাদের সাথেই থাকবে। বলে অপেক্ষা করতে লাগলেন কখন ছেলে বলে উঠবে এপ্রিল ফুল!"
গাড়িতে বসল ছেলে। জানলার কাচ দিয়ে মিটি মিটি হেসে অপেক্ষা করতে থাকলেন তিনি।
গাড়ি স্টার্ট দিল, এই বুঝি বলল বলে। জীবনে কোনদিন এপ্রিল ফুল শোনার জন্য এত অধীর আগ্রহে থাকেনি কেউ হয়তো।
চাকা ঘুরল। বাঁদর ছেলে কখন অভিনয় শেষ করতে হয় জানেনা, এবার অস্থির হলেন বৃদ্ধ। সাথে সাথেই একটা চাপা ভয় গ্রাস করল তাকে।
ডেকে উঠলেন এবার থাকতে না পেরে। চিৎকার করে উঠলেন "এপ্রিল ফুল বলে আমায় নিয়ে চল হতচ্ছাড়া।"
কান রইল এপ্রিল ফুল শোনার অপেক্ষায়, হাত ছুঁল ভেজা চোখ।
ধুলো উড়িয়ে গাড়ি টা ছোট হয়ে আসছে ক্রমশ।
অবাক হলেন, মানুষের মতো মানুষ করেছিলেন যে তিনি ছেলেকে?
দমকা হাওয়ায় লাল মাটির ধূলো আছড়ে পরল বিকাশ বাবুর গায়ে। যেন বলে গেল, 'এপ্রিল ফুল!'

*************************************** ২
প্রতি মুহূর্ত , দিন, মাস, বছর পার হয়ে যায়। তিনি ভাবতেই থাকেন - তাঁর শিক্ষ্যার গলদ টা কোথায় ছিল! তিনি তো তাঁর বাবা-মার্ শেষ দিন পর্যন্ত কোন অযত্ন করেননি।  তাঁর ছেলে-মেয়েদেরও আদর যত্নে খাইয়ে-দাইয়ে, শিক্ষা-দিক্ষ্যায় বড়ো করেছেন।  তবে তাঁর বেলায় কেন এমন হল। এই তার শিক্ষার মূল্য ? কোন উত্তর নেই। ...... শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা এই মিথ্যা এপ্রিল ফুলের  শেষ হবে কবে !

১৫ বছর পর আজও ১লা এপ্রিল। বিকাশ বাবু এখন ৭৫ বছরের বৃদ্ধ।  এখানে তিনি ভালোই আছেন - সমবয়সী বন্ধুদের সাথে খোশ মেজাজে গল্প গুজবে তাঁর দিন কাটে। মুক্ত আকাশ বাতাস গাছ পালা, পশু-পাখি এখন তাঁর  সঙ্গী; -- এখানে নেই কোনো বৌমার মুখ ঝামটানি, নেই কোনো অশান্তি ঝগড়াঝ ঝাটি।  অফুরন্ত সময়। ... শুধুই প্রহর গোনার পালা। কেবল এক চরম হতাশা ও অক্ষমতার যন্ত্রনা তাঁকে নিয়ত কুরে কুরে খেত।   এদিন গোধূলি বেলায় দোতলার বারান্দায় রেলিংয়ে হেলান দিয়ে উদাস নয়নে তাকিয়ে ছিলেন সামনের রাস্তার দিকে; বোধহয় কারোর আসার অপেক্ষ্যায়। 

অপেক্ষ্যার অবসান। হঠাৎই তিনি দেখলেন, সেই ১৫ বছর আগের ঘটনার পুনারাবৃত্তি কিন্তু পাত্র পাত্রী গেছে বদলে । বৃদ্ধাশ্রমের গেটের সামনে আর একটি গাড়ি এসে থামল।  আর বিকাশবাবু বিস্ফারিত চোখে দেখলেন , পোঁটলা-পুঁটলি কাঁধে গাড়ি থেকে নামছে তাঁর ছেলে-বৌমা। বিকাশ বাবুর নাতি রাখতে এসেছে তার বাবা-মাকে দাদুর  ওল্ড এজ হোমে।  
বিকাশবাবু হাসবেন না কাঁদবেন কিছ বুঝে উঠতে  পারছেন না।  কালো  ধোঁয়া উড়িয়ে হুস করে বেরিয়ে গেলো নাতির  গাড়ি; আর ছেলে বৌমা ফ্যাল ফ্যাল কোরে তাকিয়ে সেই নাতির চোলে যাওয়ার রাস্তার দিকে। হঠাৎ সম্বিৎ ফেরে কাঁধে কার হাতের আলতো  ছোঁয়ায়। ..... মুখ তুলে ঝাপসা দেখে কম্পিত কলেবরে বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়ে তার বাবা; শুধু কাঁপা কাঁপা গলায় বিকাশবাবু বললেন-  খোকা, আমার মতো ভুলেও কখনো ভাবিসনে যেন -  এটা 'এপ্রিলফুল'  . আর মনে মনে ভাবলেন জীবনের আর কটা দিন অন্তত একসাথে থাকা যাবে। 

- Beparoya Rajib

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন